খাবার এবং যেকোনো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলার উপকারিতা

 খাবার অথবা যে কোন কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলার উপকারিতা 


“বিসমিল্লাহ” (بِسْمِ اللهِ) অর্থ হলো “আল্লাহর নামে” বা “আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করছি।” ইসলামে কোনো ভালো কাজ শুরু করার আগে এবং বিশেষ করে খাবার খাওয়ার আগে “বিসমিল্লাহ” বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এর পেছনে কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী ঐতিহ্যের গভীর ভিত্তি রয়েছে।


কুরআনের আলোকে


১. আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করার শিক্ষা


পবিত্র কুরআন-এ আল্লাহ বলেন:


 "পড়, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।" — সূরা আল-আলাক ৯৬:১


এই আয়াত থেকে আলেমগণ বুঝিয়েছেন যে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আল্লাহর নাম স্মরণ করে শুরু করা উচিত।


২. নূহ (আ.)-এর নৌকায় আরোহণের সময়


"তোমরা এতে আরোহণ কর; এর চলা ও থামা আল্লাহর নামেই।" — সূরা হূদ ১১:৪১


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ—যাত্রা শুরু—আল্লাহর নাম নিয়ে করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।


৩. সুলাইমান (আ.)-এর চিঠি


 "নিশ্চয়ই এটি সুলাইমানের পক্ষ থেকে, এবং এটি শুরু হচ্ছে—'পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে'।" — সূরা আন-নামল ২৭:৩০


এটি দেখায় যে নবীগণও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও যোগাযোগ “বিসমিল্লাহ” দিয়ে শুরু করতেন।


হাদিসের আলোকে:


১. খাবার শুরু করার সময়


Sahih Muslim-এ রাসূল ﷺ বলেছেন:


 "তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন আল্লাহর নাম উল্লেখ করে (বিসমিল্লাহ বলে)।"


আর যদি শুরুতে ভুলে যায়, তাহলে বলবে:


"বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু" (শুরুতে ও শেষে আল্লাহর নামে।)


২. শয়তান খাবারে অংশ নিতে পারে না


সহিহ মুসলিম-এর আরেকটি হাদিসে এসেছে:


"যখন কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাবার খাওয়ার সময় আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন শয়তান বলে: তোমাদের জন্য এখানে রাত যাপন ও রাতের খাবারের কোনো সুযোগ নেই।"


অর্থাৎ “বিসমিল্লাহ” বললে শয়তানের প্রভাব ও অংশগ্রহণ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।


৩. প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের বরকত


বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে আল্লাহর নাম ব্যতীত গুরুত্বপূর্ণ কাজ বরকতহীন বা অপূর্ণ হয়ে যায়। যদিও এ বিষয়ে বর্ণিত কিছু হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তবে এর মূল শিক্ষা—আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করা—ইসলামী শিক্ষায় সুপ্রতিষ্ঠিত।


ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট:


ইসলামের শুরু থেকেই মুসলমানদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে:


খাবার শুরু করা,


ভ্রমণ শুরু করা,


লেখা-পড়া শুরু করা,


চিঠি লেখা,


ব্যবসা শুরু করা,


কুরআন তিলাওয়াত শুরু করা,


এসব ক্ষেত্রে “বিসমিল্লাহ” বলা।


প্রথম যুগের মুসলমান, সাহাবায়ে কেরাম এবং পরবর্তী ইসলামী সভ্যতায় গ্রন্থ, দলিল, চিঠি ও বৈজ্ঞানিক রচনার শুরুতেও “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” লেখা হতো। এটি শুধু একটি বাক্য নয়; বরং আল্লাহর সাহায্য, বরকত ও হিদায়াত কামনার প্রকাশ।


কেন খাবারের আগে “বিসমিল্লাহ” বলা হয়?


১. আল্লাহর দেওয়া রিজিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

২. খাবারে বরকত লাভের আশা।

৩. শয়তানের অংশগ্রহণ থেকে সুরক্ষা।

৪. প্রতিটি কাজকে ইবাদতে পরিণত করা।

৫. আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও তাঁর স্মরণ বজায় রাখা।

কেন অন্য কাজের আগেও “বিসমিল্লাহ” বলা উচিত?


এতে মানুষ মনে রাখে যে তার শক্তি ও সামর্থ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে।


কাজের মধ্যে বরকত ও কল্যাণের আশা করা হয়।


অহংকার কমে এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়।


দৈনন্দিন কাজগুলোও ইবাদতের রূপ পায়, যদি তা বৈধ ও ভালো উদ্দেশ্যে করা হয়।


সারসংক্ষেপ


“বিসমিল্লাহ” বলা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একজন মুসলিমের বিশ্বাসের প্রকাশ যে সব কাজের শুরু, সফলতা এবং বরকত আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। তাই খাবার ও অন্যান্য ভালো কাজের আগে “বিসমিল্লাহ” বলা কুরআনের শিক্ষা, রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ এবং ইসলামী ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

Previous
Next Post »